নিরক্ষরতা দূরীকরণে ছাত্রসমাজের ভূমিকা একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ প্রবন্ধ। শিক্ষার প্রসার, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে সমাজকে মুক্ত করার ক্ষেত্রে ছাত্রসমাজের অবদান অনস্বীকার্য। এই প্রবন্ধে নিরক্ষরতা দূরীকরণের প্রয়োজনীয়তা, এর প্রতিবন্ধকতা এবং এই মহতী কর্মযজ্ঞে ছাত্রছাত্রীদের কর্তব্য সুস্পষ্টভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের পাঠোপযোগী করে প্রবন্ধটি প্রাঞ্জল ও মার্জিত বাংলা ভাষায় উপস্থাপন করা হয়েছে। বিষয়টির অন্তর্নিহিত তাৎপর্য অনুধাবন এবং পরীক্ষায় সুশৃঙ্খলভাবে প্রবন্ধ রচনার প্রস্তুতির জন্য সমগ্র লেখাটি মনোযোগ সহকারে অধ্যয়ন করুন।
ভূমিকা
যার অক্ষরজ্ঞান নেই, সে নিরক্ষর। চোখ থাকতেও সে যেন অন্ধ। প্রতিটি পদক্ষেপে সে পিছিয়ে পড়ে। নিরক্ষরতা শুধু ব্যক্তির সমস্যা নয়, পুরো সমাজ ও দেশের অগ্রগতির পথে বড় বাধা। এই অন্ধকার দূর করতে সকলের এগিয়ে আসা দরকার। আর এই কাজে ছাত্রসমাজের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
নিরক্ষরতার কারণ
অতীতে স্বার্থপর মানুষ নিজেদের স্বার্থে শিক্ষাকে সীমিত রেখেছিল। তারা শোষণ চালিয়ে যেতে চেয়েছিল বলে সাধারণ মানুষকে শিক্ষিত হতে দেয়নি।
ফলে নিরক্ষরতার অভিশাপ নেমে এসেছে অধিকাংশ মানুষের ওপর। আজও অনেক জায়গায় দারিদ্র্য, কুসংস্কার আর সচেতনতার অভাবে মানুষ শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত।
স্বাধীন ভারতে নিরক্ষরতার চিত্র
দেশ স্বাধীন হয়েছে অনেক বছর। জনসংখ্যায় ভারত পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ দেশ। অথচ এখনও কোটি কোটি মানুষ নিরক্ষরতার অন্ধকারে ডুবে আছে।
স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে অনেক, কিন্তু সাক্ষর মানুষের সংখ্যা সেই অনুপাতে বাড়েনি।
গ্রামে-গঞ্জে এখনও অনেক মানুষ নিজের নাম পর্যন্ত লিখতে পারে না। ভোটের সময় তারা প্রতীক চিহ্নের ওপর নির্ভর করে। অফিস-আদালতে এখনও টিপসই চলে। অনেক কৃষক, শ্রমিক ও গৃহিণী শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত।
দারিদ্র্য, কুসংস্কার আর সচেতনতার অভাবের কারণে তারা স্কুলে যেতে পারে না বা পড়ালেখা চালিয়ে যেতে পারে না।
মেয়েদের ক্ষেত্রে সমস্যা আরও বেশি। অনেক পরিবারে মেয়েদের পড়ালেখার চেয়ে ঘরের কাজকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই চিত্রই প্রমাণ করে, স্বাধীনতার এত বছর পরেও নিরক্ষরতা আমাদের দেশের বড় সমস্যা হয়ে আছে।
সাক্ষরতার প্রয়োজনীয়তা
গণতন্ত্র সফল করতে হলে নিরক্ষরতা দূর করা জরুরি। আজকের যুগ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগ।
যে মানুষ লিখতে-পড়তে পারে না, সে আধুনিক জীবনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারে না।
কৃষকরা যদি নিরক্ষর থাকে, তাহলে তারা পুরনো পদ্ধতিতেই চাষ করে। নতুন সার, বীজ বা কৃষি প্রযুক্তির কথা তারা জানতে পারে না।
কুসংস্কার তাদের মনকে আচ্ছন্ন করে রাখে। ফলে ফসলের উৎপাদন কম হয়, আয়ও কম হয়। শিক্ষিত হলে তারা নতুন প্রযুক্তি শিখতে পারবে, ভালো ফসল ফলাতে পারবে এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে পারবে।
শ্রমিকরা শিক্ষিত হলে নিজেদের অধিকার বুঝতে পারবে। মায়েরা শিক্ষিত হলে সন্তানদের ভালোভাবে লালন-পালন করতে পারবে।
সাক্ষর মানুষ চাকরি পেতে পারে, ব্যবসা করতে পারে, স্বাস্থ্যসচেতন হতে পারে। সে ক্ষুধা জয় করতে পারে, অন্ধবিশ্বাস থেকে মুক্ত হতে পারে এবং সমাজে শান্তি আনতে পারে। তাই সাক্ষরতা শুধু ব্যক্তির উন্নতির জন্য নয়, পুরো দেশের অগ্রগতির জন্যও অপরিহার্য।
নিরক্ষরতা দূরীকরণের উপায়
নিরক্ষরতা দূর করতে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়াতে হবে। চাই গণশিক্ষা ও সার্বজনীন শিক্ষা। প্রথম ধাপ হলো অক্ষরজ্ঞান।
রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, লেখাপড়া শেখানোই আসল রাস্তা। একজনকে শিক্ষিত করলে সে অন্যদেরও শেখাতে পারে—যেমন একটি প্রদীপ থেকে অনেক প্রদীপ জ্বালানো যায়।
এজন্য নৈশবিদ্যালয় খুলতে হবে, যাতে দিনে কাজ করা মানুষ রাতে পড়তে পারে। বয়স্ক শিক্ষা কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে। গ্রামে-গঞ্জে পাঠাগার গড়তে হবে, যাতে মানুষ বই পড়ার সুযোগ পায়। বিনামূল্যে পাঠ্যবই ও খাতা-কলম বিতরণ করতে হবে। সরকারকে আরও বেশি স্কুল খুলতে হবে এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
শিক্ষিত মানুষকেও এগিয়ে আসতে হবে। প্রত্যেক শিক্ষিত ব্যক্তি যদি অন্তত একজন নিরক্ষরকে পড়তে শেখান, তাহলে নিরক্ষরতা অনেকটা কমে যাবে। ছাত্রসমাজ, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও স্থানীয় মানুষ সবাই মিলে এই কাজে অংশ নিলে নিরক্ষরতার অন্ধকার একদিন দূর হবেই।
স্বাধীন ভারতে নিরক্ষরতার চিত্র
দেশ স্বাধীন হয়েছে অনেক বছর। জনসংখ্যায় ভারত পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ দেশ। অথচ এখনও কোটি কোটি মানুষ নিরক্ষরতার অন্ধকারে ডুবে আছে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু সাক্ষর মানুষের সংখ্যা সেই অনুপাতে বাড়েনি।
ভোটের সময় প্রতীক চিহ্নের ওপর নির্ভর করতে হয়, অফিস-আদালতে এখনও টিপসই চলে—এই চিত্রই প্রমাণ করে নিরক্ষরতা এখনও বড় সমস্যা।
উপসংহার
নিরক্ষরমুক্ত সমাজ আজ আমাদের সকলের লক্ষ্য। এই মহান কাজে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব শিক্ষিত মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। বিশেষ করে ছাত্রসমাজকে এগিয়ে থাকতে হবে। নিরক্ষর মানুষের হাতে বই ধরিয়ে দিতে হবে—সেই বইই হবে তার জীবনযুদ্ধের হাতিয়ার। ছাত্রসমাজ যদি এই দায়িত্ব নেয়, তাহলে নিরক্ষরতার অন্ধকার একদিন দূর হবেই।


